সবকিছু খুলে দেওয়ার ‘ফল’ জুন শেষে

অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ৩১ মে থেকে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সব সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট ও কল-কারখানা খুলে দেয়ার পর করোনা সংক্রমণ ও মৃতের হার বেশ কিছুটা বাড়লেও এর সঙ্গে লকডাউন তুলে নেয়ার কোনো যোগসূত্র নেই।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, করোনা সংক্রমণে এখনকার যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা মূলত: ঈদের আগে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি না মেনে দেশের বিভিন্ন মার্কেট-শপিংমল-বিপণী বিতানে অসচেতন মানুষের কেনাকাটা এবং গাদাগাদি করে ঘরমুখো যাত্রার ফল।

আর ৩১ মে থেকে দেশ আনলকের যে প্রভাব করোনা সংক্রমণের ওপর পড়বে, এর ফল পেতে আরও তিন সপ্তাহ কিংবা তার থেকে কিছু বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে। অর্থাৎ এর প্রকৃত চিত্র জুনের শেষ নাগাদ পাওয়া যাবে।

অন্যদিকে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী গতি কবে নাগাদ স্থিতিশীল পর্যায়ে আসবে, তা জুলাইয়ের প্রথম দিকে জানা যাবে।

তবে অফিস-আদালত, কলকারখানা, রাস্তা-ঘাট ও গণপরিবহণে বিপুলসংখ্যক মানুষের অসতর্ক চলাফেরা অব্যাহত থাকলে এতে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস মহামারির আকার নেবে। তাই ওই সময়েও সে পরিস্থিতি অনুমান করা কঠিন হতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্টরা জানান, লকডাউন তুলে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে সংক্রমণের সংখ্যা হু হু করে বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ নেই।

কেননা, করোনায় আক্রান্ত রোগীর মাধ্যমে অন্য কেউ সংক্রমিত হলেও তার মধ্যে সে উপসর্গ জোরালোভাবে প্রকাশ পেতে নূ্যনতম এক সপ্তাহ সময় লাগে। এর আগে সাধারণত কেউ নমুনা পরীক্ষা করতে চান না। এ ছাড়া নতুন করে আক্রান্তদের মাধ্যমে দ্বিতীয় দফায় অন্যদের সংক্রমিত হতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে।

তবে বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতির সার্বিক বিষয়াদি পর্যাবেক্ষণ ও গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ভাইরাস শরীরে ঢুকলে উপসর্গ দেখা দিতে সময় লাগে গড়ে পাঁচ দিন।

কিন্তু কারও কারও ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা দিতে সময় লাগতে পারে আরও বেশি দিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ইনকিউবেশন কাল অর্থাৎ যে সময়কাল কোন ভাইরাস মানুষের শরীরে থাকে, কিন্তু এর কোনো লক্ষণ দেখা যায় না, সেই ইনকিউবেশনের সময়টা কোভিড-১৯-এর জন্য হলো ১৪ দিন পর্যন্ত।

আবার কোনো কোনো গবেষক বলছেন, এই সময়টা ২৪ দিন পর্যন্তও হতে পারে। অর্থাৎ জীবাণু এই সময়কাল শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। তাই করোনা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার বড় ধরনের ব্যত্যয় ঘটলেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া এবং তা শনাক্ত হতে দুই সপ্তাহ থেকে চার সপ্তাহ সময় লেগে যায়।

করোনার বৈশ্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনাকারীরা জানান, সারাদেশে একসঙ্গে লকডাউন তুলে নেয়া, ক্লাস্টার এরিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলাসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বিশ্বের অনেক দেশেই করোনা সংক্রমণে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে।

তবে সেটা শুরু হতে নূ্যনতম দুই সপ্তাহ সময় লেগেছে। পরবর্তী সেটা নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হলেও সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টেনে ধরতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। অনেক দেশ এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি ধাপে ধাপে লকডাউন তুলেও কোনো কোনো দেশ বিপদ এড়াতে পারেনি।

এ ছাড়া যেসব দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে লকডাউন ঘোষণা করলেও বাস্তবক্ষেত্রে সেটা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে পারেনি, বিশ্বের ওইসব ঝুঁকিপূর্ণ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার তিন মাসের মাথায় সংক্রমণের জোয়ারে আকস্মিক বড় ঢেউ লেগেছে।

ইউরোপ ও আমেরিকায় করোনা ছড়িয়ে পড়ার পর মার্চের শেষ দিকে আক্রান্তের হার বাড়তে শুরু করে। তিন মাসের মাথায় ৩১ মার্চ গিয়ে আট লাখ ছাড়ায় করোনা শনাক্তের সংখ্যা।

আর এপ্রিলের ১৫ দিনেই করোনা শনাক্ত হয় প্রায় ১২ লাখ। প্রতিবেশী দেশ ভারতে করোনায় সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা এক লাখে পৌঁছতে সময় লেগেছিল ১১০ দিন। অথচ সেটা দুই লাখে পৌঁছতে সময় লেগেছে মাত্র ১৪ দিন।

এদিকে শুধু সংক্রমণের দিক থেকেই নয়, গোটা বিশ্বে করোনায় মৃতের সংখ্যাতেও ৯০ দিন পর থেকেই বড় ধাক্কা লেগেছে। গত ১১ জানুয়ারি প্রথম মৃতু্যর পর ২ এপ্রিল ৫০ হাজার ছাড়ায় করোনায় মৃতু্য।

এরপর ১০ এপ্রিল এটি ছাড়িয়ে যায় এক লাখ। আর ১৭ এপ্রিল এসে দেড় লাখ এবং ২৫ এপ্রিল ছাড়িয়ে যায় দুই লাখ। অর্থাৎ ৯০ দিনের পর মাত্র ১৭ দিনে মৃতের সংখ্যা দ্বিগুন হয়ে পড়ে।

এসব তথ্য বিশ্লেষণে পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও একই ধারা অব্যাহত থাকলে ‘হাই স্প্রেডিং’ হবে জুন শেষে। প্রসঙ্গত, ৫ জুন বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণের ৯০তম দিন পার করেছে।

এ অবস্থায় দেশে লকডাউন তুলে নেয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক, সেটা নিয়ে বিভিন্ন মহল প্রশ্ন তুলেছে। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই পদক্ষেপ নেয়া হলেও তা বরং এর গোটা কাঠামো ভেঙে ফেলবে বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন।

তবে চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞদের অনেকের অভিমত, লকডাউন তোলার সিদ্ধান্তে কোনো ভুল নেই। অনন্তকাল মানুষকে ঘরে বসিয়ে রাখা যায় না। ফলে আজ না হোক কাল এই সিদ্ধান্ত নিতেই হতো এবং লকডাউন খুললে যে করোনা সংক্রমণ বাড়বে, এ বিষয়টিও ধরে নিতে হবে। তবে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে যাতে মৃতু্যর হার বৃদ্ধি না পায়, সে দিকে নজর রাখতে হবে।

দেশের করোনা চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশে মৃতু্য হার ১.৩৫ শতাংশ। যা বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে কম। ৮০ শতাংশ মানুষ অ্যাসিম্পটোম্যাটিক অর্থাৎ যাদের করোনার লক্ষণ নেই।

মোট আক্রান্তের নিরিখে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার হারও যথেষ্ট কম। ফলে সংক্রমণ বৃদ্ধির চলমান সংখ্যা দেখে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে লকডাউনে বসে না থেকেও করোনার সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব বলে অভিমত দেন তারা।

তবে এই আশ্বাসে আস্থা রাখতে পারছেন না খোদ স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্ট অনেকেই। তারা বলছেন, দেশের দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে লকডাউন আরও বেশখানিকটা প্রলম্বিত করা উচিত ছিল।

অর্থনীতি সচল রাখতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে সীমিত আকারে অফিস-আদালত, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং কলকারখানা খোলা যেত। পাশাপাশি ঢালাওভাবে সবাইকে কর্মস্থলে না নিয়ে এসে জনবল নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

মাত্র ২৫ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়কে গতিশীল রাখা সম্ভব হলে অন্যান্য অফিস-আদালত ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে হয়ত সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রয়োজন হতো বলে মনে করেন তারা। যা আনলক পরিস্থিতিতেও করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটা কমত।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে এখনো ভেবে দেখার যথেষ্ট সময় আছে। কেননা, মাসের প্রথম দিকে পিক ( সর্বোচ্চ সংক্রমণের সংখ্যা) পাওয়া যাবে না। এটা আরও প্রলম্বিত হবে।

তারা মনে করেন, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড যখন পুরোপুরি সচল হবে এবং পরিবহণব্যবস্থা যখন পুরোদমে চালু হবে, তখন বোঝা যাবে, আসলে সংক্রমণ কতটুকু বাড়ছে। তখন কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন এবং চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে আসবে। অথচ সে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার মতো প্রস্তুতি বাস্তবিক অর্থে এখনো নেয়া হয়নি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে সর্বোচ্চ সংক্রমণের সংখ্যা (পিক) জুন মাসের শেষে হবে, নাকি সেটি জুলাই মাস নাগাদ হবে- বিশেষজ্ঞদের কাছে এটি এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া পিক আসলেও সেটা কতটা উচ্চতায় উঠবে, সেটা এখন তাদের ভাবিয়ে তুলেছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এ প্রসঙ্গে বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে বাংলাদেশে কোনো প্রজেকশন করা হয়নি।

এটা করা হলে জুন শেষে নাকি কোন সময় পিকটা হবে, এর ধারণা পাওয়া যেত। তবে ওই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের আশঙ্কা, জুন-পরবর্তী সময়কেই ক্রিটিক্যাল ধরতে হবে। কারণ, বর্তমানে সংক্রমণের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, সেই হারে যদি বাড়তে থাকে তাহলে জুন শেষে গিয়ে হয়ত একটা পিকে পৌঁছে যাবে।

এর ওপর লকডাউন তুলে নেয়ার একটি বড় প্রভাব সংক্রমণের সংখ্যার ওপর পড়বে। এই সময় সংক্রমণের সংখ্যা চার হাজার, এমনকি পাঁচ হাজারও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে লকডাউনের চেয়ে জনগণের সচেতনতাই বেশি জরুরি। সুইডেনসহ বিশ্বের বেশকিছু দেশ লকডাউন ছাড়াই করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

তবে বাংলাদেশের মানুষের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান এবং অভ্যাসগত দিক বিবেচনায় তা বাস্তবায়ন অনেকটাই অসম্ভব। এ ক্ষেত্রে লকডাউনের মেয়াদ আরও কিছুটা দীর্ঘয়িত করা সম্ভব হলে তা দেশের জন্য মঙ্গল হতো।

আনলকের প্রভাবে সংক্রমণের হার ব্যাপকহারে বাড়লে বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা দেয়া কতটা সহজ হবে এবং এ জন্য যে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে, সেটা পর্যাপ্ত কিনা, তা বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করা জরুরি বলে মত দেন তিনি। সূত্র: যায়যায় দিন।

আরও খবর